বাচ্চারা খাবার খেতে চায় না কেন? বাচ্চাদের খাবার খেতে না চাওয়ার কারণ ও এর সমাধান

বাচ্চাদের খাবার না খেতে চাওয়ার সমস্যার সমাধান


প্রধানত বাচ্চাদের খাবারে অরুচির কারণে বাচ্চারা খেয়ে কোন না। বাচ্চার খেতে না চাওয়ার ফল অনেকটাই খারাপ হয়ে পারে। খাবারের প্রতি তাদের অরুচি তাদের স্বাস্থের জন্যে ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে মায়েদের জন্যে একটি দুশ্চিন্তার কারণ। 

আর্টিকেলটির মাধ্যমে আমরা আপনাকে জানতে চলেছি আপনার বাচ্চা খেতে চায় না কেন? বাচ্চাদের খাওয়ার অরুচি হওয়ার কারণ কি এবং কিভাবে বাচ্চাদের খাবারের অরুচি দুর করা যায়। সুতরাং এসব তথ্য আপনার ও আপনার বাচ্চার জন্য অনেকটাই উপকারী প্রমাণিত হবে তাই গুরুত্বপূর্ন এসব তথ্য জানতে সম্পূর্ন আর্টিকেল পড়ার অনুরোধ রইল।


বাচ্চাদের খাবার খেতে চায় না কেন?

মূলত খাবারের অরুচির কারণেই বাচ্চার খাবার খেতে চায় না। বিভিন্ন কারণে বাচ্চারা খাবারের প্রতি অনীহা বা অরুচি সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় কোনো ভাইরাসের আক্রমনে শরীরে সূক্ষ জ্বর থাকার কারণে খাবারের প্রতি অরুচি দেখা দেয়। 

এছাড়াও কোনো খাবারের বিশেষ গন্ধ তাদের মধ্যে সেই খাবারের প্রতি অরুচিশীল করে তোলে তাই তারা সেই খাবার খেতে চায় না। বাচ্চাদের না খেতে চাওয়ার যতগুলো কারণ আছে তার সবগুলো এই নিবন্ধের পরবর্তী আলোচনায় উল্লেখ করা হবে। 


বাচ্চারা খাবার খেতে না চাওয়ার কারণ কি?

এই সমস্যার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে যেমন, বাচ্চার শারীরিক অসুস্থতা তার খাবারের প্রতি অরুচির অন্যতম কারণ। অনেক সময় বাচ্চার পছন্দের খাবার না পাওয়ার কারণে খাবারের প্রতি তার অনীহা সৃষ্টি হয়। 

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাইরের বিভিন্ন খাবার যেমন, চকলেট, চিপস ইত্যাদি খাওয়ার কারণে ভালো খাবারের প্রতি বাচ্চাদের রুচি নষ্ট হয়ে যায়। 

চলুন দেখে নেই কি কি কারনে আপনার বাচ্চা খাবার খেতে চাচ্ছে না এবং কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চললে আপনার বাচ্চা স্বাভাবিক খাবার খেতে শুরু করবে। কিভাবে খাবারের অরুচি দুর করবেন? ( link ) সেটা বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেল পড়ার অনুরোধ রইল।


১. বয়স অনুসারে সঠিক খাবার না দেওয়া

মূলত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত একটি বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ খায় এই বয়সে আগে তাকে কোনোভাবেই অন্য কোনো ধরনের খাবার খাওয়ানো হয় না। ছয় মাসের পরেই বাচ্চার খাবারের তালিকার হালকা কঠিন খাবার যুক্ত হতে শুরু করে। 

অনেক মা যে ভুল করে সেটা হল ৬ কিংবা ৮ মাস পেরোতে না পেরেতেই বাচ্চাকে ভাত ও  রুটির মত কঠিন খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করে। আপনাকে বুঝতে হবে এটা তার বয়স অনুযায়ী যথেষ্ট কঠিন খাবার।

এই বয়সে বাচ্চাকে সুজি, সাবু, সেমাই, গালানো ভাত ইত্যাদি খাবার দেওয়াই শ্রেয়। তাই সর্ব প্রথমে আপনাকে বাচ্চা বয়স অনুযায়ী খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে তার সকল খাবারের প্রতি রুচি ফিরে আসবে।


২. পছন্দের খাবার না দেওয়া

পছন্দের খাবার না পাওয়া বাচ্চাদের খাবারের অরুচির পিছনে অন্যতম কারণ। সাধারণত ১ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চারা দুধ খাওয়া চালিয়ে যায়। যেহেতু দুধে তারা মিষ্টি স্বাদ পায় তাই তাদের মিষ্টি খাবার এর প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। 

এই এই সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের মিষ্টি খাবার খাওয়ালে তারা সেটি সহজেই গ্রহণ করবে। মিষ্টি সবজি যেমন গাজর, আলু সামান্য চিনি দিয়ে ভালোভাবে সিদ্ধ করলে সেই সবজি বাচ্চারা খেতে অনিচ্ছা দেখাবে না। 

এছাড়া মা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হল আপনার বাচ্চার পছন্দের খাবার চিনে নেওয়া। যেমন, কোন খাবারটি আপনার বাচ্চা সহজেই খাচ্ছে, কোন খাবারটি সেই পরিমাণে বেশি খাচ্ছে সেটা খেয়াল করলেই আপনার বাচ্চার পছন্দের খাবার খুঁজে পাবেন। আর বাচ্চার পছন্দের খাবার না পাওয়া তার খেতে না চাওয়ার অন্যতম কারণ। 


৩. অসুস্থতা

মূলত অসুস্থতা যেকোনো খাবারের প্রতি অরুচি এনে দেয়। কখনো কখনো দেখা যায় বাচ্চা জ্বরে ভুগছে এবং খেতে চাইছে না, এর প্রধান কারণ হল সেই সময়ে তার শরীরে ভাইরাস এর আক্রমণের কারণে জ্বর আসায় তার খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। 

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অসুস্থতা থেকে শরীর সুস্থ হতে শুরু করেছে এমন সময়ও বাচ্চা কিছুটা খাবারের প্রতি অরুচি দেখায়। তাই অসুস্থতা আপনার বাচ্চার না খেতে চাওয়ার পিছনে একটা বিরাট কারণ হতে পারে। 


বাচ্চার খেতে না চাওয়ার সমস্যা কিভাবে দুর করা যায়?

বাচ্চাদের না খাওয়া সমস্যা দুর করার বেশ কিছু  কার্যকরী ও পরিক্ষিত উপায় আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি। এসব উপায় শিশু বিশেষজ্ঞ কর্তৃক পরীক্ষিত এবং কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। তাই আপনার সন্তানের না খাওয়ার সমস্যা সমাধানের জন্যে এসব পদ্ধতি, ট্রিক্স বা মেথড প্রয়োগ করে দেখুন, নিশ্চই আপনি ভালো ফলাফল পাবেন। 


বাচ্চাদের খাওয়ানোর উপায়

স্বভাবতই বাচ্চারা একটু কম খায় বা খাবার নষ্ট করে থাকে এটা স্বাভাবিক। তাই আপনি বাচ্চাকে ততটাই খাওয়াবেন যতটা সে স্বাভাবিকভাবে খেতে চাইবে তাকে জোরপূর্বক খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। এছাড়া বাচ্চাদের পাকস্থলী খুবই ছোট তাই ভাত বা রুটি কিংবা অন্যান্য শর্করা জাতীয় খাবার জোর করে খাইয়ে তাকে ভরপেট রাখাটা বোকামি। 

নিচে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সঠিক উপায় তুলে ধরলাম, এসব উপায় বাচ্চাকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করলে আপনার বাচ্চা খাওয়ার গতি ও রুচি দুটোই বৃদ্ধি পাবে। 


১. খাবারের সঠিক পরিবেশ তৈরি

খাওয়ানোর বিভিন্ন সামগ্রী যেমন প্লেট, সুন্দর সুন্দর মগ, বসার চেয়ার কিংবা টুল সাথে ছোট টেবিল ইত্যাদি বাচ্চার খাওয়ানোর সময় সাজিয়ে ফেলুন। এসব সামগ্রী শহীদ খাবারের একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলে আপনার বাচ্চা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করবে যে এখন তার খাওয়ার সময়।

এরকম পরিবেশ তৈরির ফলে এবং সময়মত এসব সামগ্রী দেখার সাথে সাথেই তার মনে এমন ধারণা জন্ম নেবে যে আমার খাওয়া সময় হয়ে গেছে তাই মা  আমার খাবারের জন্যে টেবিল ও চেয়ার রেডি করছে। এতে করে তার মাঝে খাওয়ার একটি আনুষ্ঠানিকতা জন্ম নেবে এবং খাওয়ার পুরো সময়টাই সে খেলাধুলার মতোই উপভোগ করবে। 


২. বাচ্চাকে তার মত খেতে দিন

বাচ্চাকে নিজে নিজে খেতে দেওয়ার মাধ্যমে আপনি বাচ্চার না খাওয়া সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধান করতে সক্ষম হবেন। দেখুন, প্রত্যেক বাচ্চাই খেতে ভালোবাসে কিন্তু খাওয়াটা তার কাছে তখনই বিরক্তিকর হয়ে ওঠে যখন সেটা তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। 

এতে করে সে খাওয়ার সময় এই ভয়ে থাকে যে, এই না মা আমাকে জোর করে খাইয়ে দিয়ে পেট ফাটিয়ে ফেলে 😄। তাই, আপনার বাচ্চাকে স্বাধীনভাবে খেতে দিন তাহলে সেটি তার জন্য খুবই উপকারে আসবে। 

খাবারগুলো নেড়েচেড়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাওয়ার মাধ্যমে সে আনন্দ পাবে এবং তার প্রয়োজন মত খেয়ে নেবে। সামান্য খাবার বাচ্চা নষ্ট করবেই এটা আপনাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিতে হবে।


৩. বিকল্প খাবার রাখা

অনেক সময় এমনটা হতে পারে যে আপনি যে খাবার তৈরি করেছেন সেটি আপনার বাচ্চা খেতে চাচ্ছে না, সেই ক্ষেত্রে আপনাকে বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর ফলে সেই সময়ের জন্য আপনার বাচ্চাকে না খেয়ে থাকতে হবে না। 

এটা স্বাভাবিক যে সবসময় বাচ্চারা এক রকমের খাবার খেতে চায় না। তাই মাঝে মাঝে তাদের জন্য বিকল্প কিংবা ভিন্ন কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে হয় যাতে করে বাচ্চা সেই সময়ের মিল মিস না করে। 

মনে রাখবেন বাচ্চার খাবার সময়মতো খাওয়াতে হয় এবং নিয়মিত সঠিক সময়ে খাওয়ানোর অভ্যাস করলে আপনার বাচ্চার না খাওয়ার সমস্যা দূর করা সম্ভব। 


৪. খাওয়ার সময় বাচ্চাকে অন্যমনস্ক করবেন না

অনেকেই বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় টিভি দেখান অথবা হতে মোবাইল ফোন হাতে ধরিয়ে দেন। এটি একটি খারাপ অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। এতে করে আপনার বাচ্চা সাময়িক সময়ের জন্য খাবার খেলেও এই পদ্ধতি বাচ্চার না খাওয়ার সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারে না। 

বাচ্চাকে খাওয়ার সময় টিভি কিংবা স্মার্টফোন দেখানোর ফলে বাচ্চার সব-কনশিয়াস মাইন্ড ডাইভার্ট হয়ে খাবারের পরিবর্তে স্মার্ট ফোন কিংবা টিভিতে চলে যায়। এতে করে খাবারের প্রতি বাচ্চা অমনোযোগী হয়ে ওঠে।

অনেকেই বলবেন, এভাবে তো আমার বাচ্চা নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করছি কই তার তো কোন সমস্যা হচ্ছে না? যেমনটা আমি বলেছি খাওয়ার সময় টিভি কিংবা স্মার্টফোন দেখার ফলে তার ব্রেন খাবারের পরিবর্তে টিভি কিংবা স্মার্টফোন বেশি একটিভ থাকে। এর ফলে আপনার বাচ্চা কোনো খাবার মজা করে খেতে পারে না, সে আসলে টিভি দেখে মজা পাচ্ছে খাবার খেয়ে না। 

এর আরো একটি মারাত্মক দিক হল, সে কোন খাবার খেলে বা কোন খাবারটি তার কাছে বেশি ভালো লাগলো এই বিষয়গুলোর কোনোটাই তার ব্রেনে স্টোর হচ্ছে না। তাই অবশ্যই অবশ্যই বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় disturbance থেকে দূরে রাখুন।


৫. বাচ্চাকে ছড়া, গান ও কবিতার শুনিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন

খাওয়ানোর সময় বাচ্চার সাথে গল্প করুন, তাকে এমনটা অনুভব করানোর চেষ্টা করুন যে, খাওয়ার সময়টা পুরোটাই একটা বিনোদনের সময় বা মায়ের সাথে খেলার সময়। এর ফলে খাবারের সময় হলেই তার ভেতরে একটা ভালোলাগা কাজ করবে। সে আনন্দের সাথে খেতে চাইবে। 

এছাড়া খাওয়ানোর সময় আপনার বাচ্চাকে ছড়া, কবিতা কিংবা গান শুনিয়ে হাসিখুশি রাখতে পারেন। এভাবে সে কখনোই খাওয়ার সময় কোন ধরনের  বিরক্তি অনুভব করবে না বরঞ্চ অনেক মজাকরে  আনন্দের সাথেই খাবার গ্রহণ করবে। 


পরিশেষে বলা যায় 

উপরে আলোচিত বাচ্চাকে খাওয়ানোর কৌশল কিংবা উপায় গুলো যথেষ্ট কার্যকরী এবং পরীক্ষিত। এসব উপায় আপনার বাচ্চার না খাওয়ার সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধান করতে সক্ষম হবে।

মূলত বাচ্চার না খাওয়া পিছনে অরুচি কিংবা তার মানসিক কতগুলো বিষয় কাজ করে। অনেক সময় মায়ের বিভিন্ন ত্রুটি বাচ্চার মনে খাবার এর প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। উপরে আলোচিত hacks গুলোতে মায়েদের বিভিন্ন ভুল ও বাচ্চার না খাওয়ার পিছনে সাইকোলজিক্যাল কারণ গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কিভাবে সমস্যা গুলো সমাধান করা যায় তার উপায় গুলোও নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। 


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url